মাথাব্যাথা দূর করার সহজ সমাধান

 


মাথা ব্যথার কারণ এবং মাথাব্যাথা দূর করার সহজ সমাধান:

মাথাব্যথা শব্দের সাথে আমারা সবাই  পরিচিত । এক গভেষণায় জানা গেছে প্রায় দেড়শ’ প্রকারের মাথা ব্যাথা রয়েছে । প্রতি ক্ষেত্রে  মাথাব্যথার ধরণ আলাদা আলাদা  । তাহলে মাথাব্যথা কি ? মূলত মাথা ও ঘাড় বরাবর ব্যথা হলেই আমরা তাকে মাথাব্যথা বলি । মাথাব্যথার উৎপত্তি হয় চোখ, কান, ঘাড়ের মাংস পেশি, মাথার চামড়ার মাংসপেশি, ব্রেইন ও হাড়ের আবারণ সহ চারপাশের রক্তনালী, নার্ভের আবরণ,ও সাইনাসের প্রদাহ এবং টান থেকেই ।


মাইগ্রেন ও টেনশন মাথাব্যথার খুবই পরিচিত দুটি কারণ । বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, মাথাব্যথা 70 শতাংশই হয় টেনশন থেকে আর মাথাব্যথার 11 শতাংশ দায়ী মাইগ্রেন থেকে। আর ক্লাস্টার  থেকে শতকরা 0.1 ভাগ মানুষের মাথা ব্যথা হয় ‍। এছাড়া কতিপয় আরো কিছু মাথাব্যথা রয়েছে যেমন: সাইনাস হেডেক, থান্ডারক্ল্যাপ হেডেক,  এলার্জি হেডেক, এয়ারপ্লেন হেডেক, এক্সরসনাল হেডেক সহ আরো বিভিন্ন প্রকার হেডেক বা মাথা ব্যাথা হয়ে থাকে ।


টেনশন টাইপ হেডেক : এর লক্ষণ গুলো হলো মাথার চারদিক  জুড়ে ব্যথা,আর  মনে হবে  মাথা  কেউ চেপে ধরে আছে । এ ধরনের ব্যথা সাধারণত  দীর্ঘস্থায়ী হয় না ।  কিন্তু  কয়েক ঘন্টা  অথবা  কয়েকদিন পর্যন্ত  হতে পারে ।  টেনশন হেডেক  মূলত টেনশন থেকে  হয় । এটি নির্ভর করে একজন মানুষ কতটুকু চাপ সহ্য করার ক্ষমতা রাখে, জেনেটিক্স , ব্যক্তির নিজের ওপর ও তার স্ট্রেসের দৃষ্টিকোণ এর উপর ।টেনশন হেডেক নাম থেকেই আমরা বুঝতে পারি এর প্রধান কারণগুলো হতে পারে বিষন্নতা, দুশ্চিন্তা, যেকোনো ধরনের মানসিক চাপ থেকে । গবেষণায় জানা গেছে এই রোগে মধ্যবয়স্ক ব্যক্তিরা ওনারীরা বেশি ভোগে এছাড়াও দেশ,জাতি,ও বয়স অনুযায়ী ভিন্নতা দেখা যায় ।


অবশ্যই বুঝতে পারছেন টেনশন টাইপ হেডেক থেকে মুক্তি পেতে হলে অবশ্যই মানসিক চাপ কমাতে হবে ।আর আপনি ওষুধ হিসেবে ব্যথানাশক ওষুধ প্যারাসিটামল খেতে পারেন । এক গবেষণায় জানা গেছে, শুধুমাত্র অ্যাসপিরিন,অ্যাসিটামিনোফেন এবং ক্যাফেইনের সমাহারে ওষুধ খেলে কয়েক ঘন্টায় এই টেনশন হেডেক মাথাব্যথা কমে যায় ।


মাইগ্রেন হেডেক: মাথার একপাশে অর্থাৎ মাথার বাম পাশ অথবা ডান পাশ যখন ব্যথা হয় তখন তা মাইগ্রেন হেডেক । মাইগ্রেন হেডেক হওয়ার বারটির ও বেশি কারণ রয়েছে । আর এর থেকে পরিত্রান পাওয়া খুব একটা সহজ নয় । এই মাইগ্রেন হেডেক বংশগত বা কোন অজ্ঞাত কারণে হতে পারে । এই মাথাব্যথা পুরুষের তুলনায় মহিলারা বেশি হয় । যদিও এটি বংশগত সমস্যা কিন্তু তার পরেও আমাদের কিছু খারাপ অভ্যাসের কারণে এই এই ধরনের মাথাব্যথা হতে পারে যেমন: বেশি পরিমাণে চকলেট, কফি, পনির ইত্যাদি খাওয়া এছাড়া জন্মবিরতিকরণ ওষুধ, দুশ্চিন্তা, অতিরিক্ত ভ্রমণ, ব্যায়াম, অনিদ্রা, অনেকক্ষণ টিভি দেখা, অনেকক্ষণ কম্পিউটারে কাজ করা, মোবাইলে অনেকক্ষণ যাবৎ কথা বলা ও মানসিক চাপ, কোষ্ঠকাঠিন্য,অতি উজ্জ্বল আলো এই রোগের কারণ হতে পারে । এই মাথাব্যথা বয়সন্ধিকাল থেকে শুরু হয়ে মাঝ বয়স পর্যন্ত হতে পারে। এই মাথা ব্যথা শুরু হলে কয়েক দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে । এই মাথাব্যথা অন্যতম লক্ষণ, মাথা ব্যাথা সহ, বমিভাব, অতিরিক্ত হাই তোলা, যেকোনো কাজে মনোযোগ নষ্ট হওয়া, বিরক্তি বোধ করা, শব্দ ও আলো ভালো না লাগা, অতিরিক্ত শব্দ ও আলোতে মাথাব্যথা আরো বেড়ে যাওয়া ।


মাইগ্রেন হেডেক থেকে রক্ষা পাবার জন্য অবশ্যই কায়িক কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে এবং বেশি পরিমাণে বিশ্রাম নিতে হবে । প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যেতে হবে ও নির্দিষ্ট সময় ঘুম থেকে উঠতে হবে এবং অবশ্যই ঘুম পরিমাণমত হতে হবে। কম আলো,কড়া রোদ, তীব্র ঠান্ডা পরিবেশ পরিহার করতে হবে । অবশ্যই উচ্চ শব্দ,কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে বেশিক্ষণ না থাকায় ভালো । এর থেকে রক্ষা পেতে হলে অবশ্যই চা-কফি ও কোমল পানীয়, চকলেট, দুধ, আইসক্রিম,মাখন,  টক জাতীয় ফল, চিনাবাদাম, কলা ও পেঁয়াজ সহ কিছু কতিপয় খাবার ত্যাগ করতে হবে । সর্বোপরি ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিরোধক ঔষধ ও চিকিৎসা নিতে হবে ।


সাইনাস হেডেক: আমাদের দেহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হল সাইনাস । সাইনাস মূলত আমাদের নাকের চার দিকে বায়ু প্রকোষ্ঠের একটি ঝিল্লি । আর সাইনাসের ভিতরে পানি ধূলিকণা জমলে কিছুদিন পর আমাদের মাথা ব্যাথা শুরু হয় । আর এ সাইনাস হেডেক মানুষের তিন মাসের বেশি সময় ধরে প্রদাহ থাকতে পারে ।


সাইনাস হেডেক থেকে বাঁচতে আপনাকে ঘরোয়া কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন । যেমন: সাইনোসাইটিস থেকে মুক্তি পেতে আপনি গরম সেঁক দিতে পারেন অথবা নাক দিয়ে জলীয় বাষ্প গ্রহণ করতে পারেন । এতে করে আপনার সাইনাসে যেসব বজ্র ছিল তা গলে বেরিয়ে আসবে ফলে আপনি সাইনাস জনিত মাথাব্যাথা পেতে পারেন । আরেকটি কার্যকারী পদ্ধতি হলো বাষ্পায়িত গোসল, ঝাঁঝালো খাবার,  দারুচিনি ও আদা খাওয়া, সবচেয়ে ভাল পদ্ধতি হলো স্যালাইন স্প্রে করা । স্যালাইনের স্প্রে সাইনাস হেডেক থেকে মুক্তি ও নাক পরিষ্কার রাখতে সহায়তা করে ।


থান্ডারক্ল্যাপ হেডেক: মাথাব্যথার রোগের সবচেয়ে বিপদজনক বিপদজনক থান্ডারক্ল্যাপ হেডেক ।  কারণ এক্ষেত্রে আপনার মাথার যেকোনো অংশে ব্যথা অনুভূত হতে পারে । প্রচন্ড ব্যাথায় আপনার বজ্রাঘাত অনুভূতি হবে ।  বিজ্ঞানীরা জানিয়েছে এই ব্যথা খুবই তীব্র এবং কমপক্ষে 5 মিনিট স্থায়ী হয় । আর এর কারণ আপনি বুঝতেই পারবেন না । তাই মাথা ব্যথা রোগের মধ্যে এ ধরনের মাথাব্যথা খুবই বিপদজনক ।


তাই আপনি যদি এই থান্ডারক্ল্যাপ হেডেক এ আক্রান্ত হন তাহলে দেরি না করে ডাক্তারের শরণাপন্ন হন । কারণ এই মাথাব্যথা থেকে আপনার ব্রেইন অ্যানিউরিজম, স্টোক, ব্রেইন হেমোরেজ হতে পারে এক্ষেত্রে যতদূর সম্ভব আপনাকে চিকিৎসাসেবা নিতে হবে ।


ক্লাস্টার হেডেক: আরো একটি যন্ত্রণাদায়ক মাথাব্যথার কারণ হতে পারে ক্লাস্টার হেডেক । ক্লাস্টার হেডেক হলে আপনার মনে হবে  চোখের পেছনে থেকে কোন কিছু আপনাকে খোঁচা দিচ্ছে । বিজ্ঞানীরা একে সুসাইড হেডেক ও বলে । কারণ এর ব্যথার তীব্রতা খুবই বেশি । এটিতে নারীদের চেয়ে পুরুষরা বেশি আক্রান্ত হয় । এই রোগের কিছু উপসর্গ রয়েছে যেমন: ব্যথার সঙ্গে চোখ লালতা হওয়া, চোখ থেকে পানি পড়া, চোখের পাতা ঢলে পড়া ইত্যাদি ।


ক্লাস্টার হেডেকের চিকিৎসা জন্য ডাক্তার আপনাকে হাই-ফ্লো অক্সিজেন ট্রিটমেন্টের পরামর্শ দিতে পারে । সর্বোপরি আপনাকে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে যথাযথভাবে চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে । এই রোগ সাধারণত রক্ষণাবেক্ষণের প্রভাবে কিছুটা কমে যায় ।


এয়ারপ্লেন হেডেক: আপনার কি আকাশ পথে ভ্রমণের সময় মাথা বা কপালের যে কোন এক পাশে ব্যথা অনুভূত হয় । তাহলে বুঝতে হবে আপনার এয়ারপ্লেন হেডেক হয়েছে । গবেষণায় জানা গেছে প্রতি বার জনের একজন এই এয়ারপ্লেন হেডেকে ভোগে । এর কারণ হতে পারে আকাশ ভ্রমণে আপনার মানসিক চাপ ও স্টেসের।


তাই এয়ারপ্লেন হেডেক এর ঝুঁকি কমাতে স্ট্রেস বা মানসিক চাপকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে । আর এই ব্যথার শুরু হচ্ছে বলে অনুভূতি হলে, ওভার দ্য কাউন্টার পেইন কিলার সেবন করতে পারেন ।


এলার্জি হেডেক: এলার্জি হেডেক এর প্রধান লক্ষণ হলো মাথার উপরিভাগে বা মুখমণ্ডলের উপরিভাগে ব্যাথা অনুভূত হওয়া । সাইনাস এর সঙ্গে এলার্জি হেডেকের কিছুটা মিল থাকলেও, এলার্জি হেডেক মূলত ঋতুভিত্তিক হয়ে থাকে । এছাড়া এর কিছু উপসর্গ লক্ষ্য করা যায় যেমন ঠান্ডা এলার্জির কারণে নাক থেকে তরল আশ, হাচি ও চোখ থেকে পানি নিঃসরণ দেখা দিতে পারে । ডাক্তাররা এই সমস্যা শনাক্ত করার জন্য ডায়াগনোসিস করে থাকে ।


এই এলার্জি হেডেক থেকে মুক্তি পেতে হলে আপনাকে এন্টিহিস্টামিন এবং ডিকনজেসপেন্ট ব্যাবহার করতে হবে। যে সকল কার্যক্রমে এলার্জি জড়িয়ে থাকে সেগুলো এড়িয়ে চলতে হবে ।এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনমতো এন্টিবায়োটিক প্রয়োগের পাশাপাশি অবশ্যই ডাক্তার দেখাবেন ।


No comments

Powered by Blogger.